সংসদের বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা অবৈধ

Posted on


সংসদের বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা অবৈধ

উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ করতে পারবে না জাতীয় সংসদ। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুলের শুনানি শেষে গতকাল বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে এ রায় দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ দুই সদস্য বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করলেও কনিষ্ঠ সদস্য বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল রুল খারিজ করেন। এর ফলে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা। একই সঙ্গে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের বিষয়টিও বহাল থাকছে। তবে হাইকোর্টের এ রায় স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার যে বিধান রয়েছে, ষোড়শ সংশোধনী তার পরিপন্থী। বিশ্বের কিছু দেশে আইনসভার কাছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও একসময় এ বিধান ছিল। তবে সেটি ইতিহাসের দুর্ঘটনা মাত্র। কমনওয়েলথভুক্ত অধিকাংশ দেশে সংসদের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণ করা হয় না। ৬৩ শতাংশ দেশে এ প্রক্রিয়ায় বিচারপতি অপসারণ করা হয় না। রায়ে আদালত বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আমাদের দেশের সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেন না। দল যে সিদ্ধান্ত নেয়, তার পক্ষেই তাদের ভোট দিতে হয়, এমনকি তারা যদি বিষয়টি সঠিক মনে নাও করেন। এ পরিস্থিতিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বহাল থাকলে বিচারপতিকে সংসদ সদস্যদের করুণাপ্রার্থী হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশে সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ওই সব দেশের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আমাদের সংসদ সদস্যদের মেলানো ঠিক হবে না। ওই সব দেশের সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। সেসব দেশে আমাদের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো কোনো বিধান নেই। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের মতামতের বাইরে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়ে যাবে। বহু মূল্যবান প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংশোধনীর বিষয়ে জনগণের ধারণা কী। এতে যদি জনগণ মনে করে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে, তাহলে বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের আস্থা হারাবে। ন্যায়বিচার নিয়ে জনগণের মনে সংশয় সৃষ্টি হবে। ষোড়শ সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতির পরিপন্থী। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা হলো।’ ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। সংবিধানের এ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের নয়জন আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানির পর ষোড়শ সংশোধনী কেন অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। গত বছর ২১ মে রুলের শুনানি শুরু হয়। গত ১০ মার্চ রুলের শুনানি শেষে ৫ মে রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়। রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোতাহার হোসেন সাজু। এ ছাড়া অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি। রুলের ওপর শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম অংশ। জাতীয় সংসদের হাতে বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা-সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করতে পারে। তাই এ সংশোধনী সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী গণ্য করা যেতে পারে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে বলেছিলেন, ‘বিচারপতিদের অপসারণের প্রক্রিয়া আগে ছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। ষোড়শ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, সংসদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এ অপসারণ করবেন। আর সংসদ তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ দেবে। ওই তদন্ত কমিটি কীভাবে গঠিত হবে সে বিষয়ে একটি বিল এখন পর্যন্ত বিবেচনাধীন রয়েছে। এটি আইনে পরিণত হলেই এ বিষয়ে কজ অব অ্যাকশনের উদ্ভব হবে। তাই আমার বক্তব্য হলো, এ ধরনের মামলা করার সময় আসেনি। আইন হওয়ার পর আইনে যদি কোনো ধরনের ব্যত্যয় হয়, সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখনই এটা চ্যালেঞ্জ করার কারণের উদ্ভব হবে। এ কারণে রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়।’ তবে রিট আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ শুনানিতে বলেছিলেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারপতি অপসারণের বিধানটি ছিল। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে আপিল বিভাগও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওই বিধানটির সুরক্ষা দেন। এই সুরক্ষার পর পঞ্চদশ সংশোধনী যখন পাস হয়, তখন সংসদ ওই ৯৬ অনুচ্ছেদকে সংরক্ষিত করেছিল। হঠাৎ করে কিছু দিন পর ৯৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করে এ ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবিধানের মৌল কাঠামোকে পরিবর্তন করে এ পরিবর্তন হয়েছে। কারণ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে থাকা ৭(বি) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মৌল কাঠামো পরিবর্তন করা যাবে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মূল কাঠামো। যেহেতু ‘মূল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে’, সেহেতু ষোড়শ সংশোধনী সংবিধান পরিপন্থী। এই ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে। এদিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করে আনা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ বলে দেওয়া হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করবে রাষ্ট্রপক্ষ। হাইকোর্টের রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। গতকাল নিজ কার্যালয়ে তিনি বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। রবিবার রায়ের স্থগিতাদেশ চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন জানাব।’ ১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত থাকলেও ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে আবার ফিরিয়ে আনা হয়। ষোড়শ সংশোধনীর ৯৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্যসংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ছাড়া কোনো বিচারককে অপসারিত করা যাবে না। ৯৬(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দফা (২)-এর অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোনো বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সেই তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি এবং অপসারণের প্রক্রিয়া ঠিক করে তৈরি একটি আইনের খসড়ায় গত ২৫ এপ্রিল নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

ben

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s