রহস্য উন্মোচনের আগেই বন্দুকযুদ্ধ মাদারীপুরে শিক্ষককে হত্যা চেষ্টাকারী ফাহিম নিহত, নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের প্রশ্ন

Posted on


বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটে আদালতে তোলা হলেও ফাহিমকে অভিযানে নেওয়া হয় গেঞ্জি পরিয়ে 

ddbenapole-202

মাদারীপুরে সরকারি নাজিম উদ্দিন কলেজের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার ঘটনার রহস্য উন্মোচনের আগেই পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গ্রেফতার ফাইজুল্লাহ ফাহিম নিহত হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মিয়ারচর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ফাহিম। ফাহিমের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অনেক তথ্যই আড়ালে পড়ে গেল কি না এমন প্রশ্নও তুলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। অভিযানে ফাহিমের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি কেন—এমন প্রশ্নও তুলেছেন তাদের অনেকে। তারা বলছেন, রিমান্ডে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে ফাহিমের কাছ থেকে আরও তথ্য আদায় করা সম্ভব হতো। সরকারের জঙ্গি দমনে ওই তথ্যগুলো অনেক কাজে দিত।

বুধবার ঘটনাস্থল থেকে জনতা ধাওয়া দিয়ে ফাহিমকে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। শুক্রবার ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিন রিমান্ড চাইলে আদালত ১০ দিন মঞ্জুর করে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্পর্শকাতর ফৌজদারি মামলার তদন্তে আরও অনেক সতর্ক থাকা উচিত ছিল। ফাহিমকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে এতে করে সরকারের বিশেষ অভিযানে আরও অনেক সাফল্য আসত বলেই আমার বিশ্বাস।’ আদালতে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে হাজির করা এবং অভিযানে কোনো ধরনের নিরাপত্তাসামগ্রী রাখা হয়নি কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি অনেকের মতো আমাকেও কিছুটা ভাবিয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দানকারী কর্মকর্তার আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’ একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলছেন, ফাহিমকে টিএফআই (টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন) সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার কাছ থেকে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদায় করা সম্ভব হতো। ওই সেলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। আদায় করা তথ্যগুলো জঙ্গি দমনে কাজে আসত।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জঙ্গি সংশ্লিষ্টরা রাষ্ট্রের অজানা শত্রু। রাষ্ট্র অজানা শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এই অজানা শত্রুদের পরাজিত করতে হলে যেভাবে কাজ করা উচিত, সরকার সেদিকে যাচ্ছে না। হাতেনাতে আটক করে আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার পর তাকে ক্রসফায়ারে দিচ্ছে পুলিশ। এটা জঙ্গিবিরোধী সংগ্রামকে আটকে দেবে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের আসামিদের যেখানে রাষ্ট্র খুঁজে পাচ্ছে না, সেখানে সাধারণ মানুষ একজনকে হাতেনাতে ধরিয়ে দিল, আদালত আসামিকে রিমান্ড দিল, আদালতের কাস্টডিতে থাকা আসামিকে কীভাবে ক্রসফায়ারে দেওয়া হলো আমার জানা নেই। ইউরোপ-আমেরিকার পুলিশের সঙ্গে আমাদের দেশের পুলিশকে মেলানো যাবে না। একটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দীর্ঘ সময় তার আদ্যোপান্ত বের করতে হবে। কিন্তু আমাদের পুলিশ যেভাবে এ ধরনের আসামিকে ক্রসফায়ারে দিচ্ছে, তাতে এ ঘটনার আর কোনো তদন্ত হবে না বা আমরা কিছু জানতে পারব না। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা চলে আসবে। তারা মনে করবে, ধরিয়ে দিলেও কিছু হয় না। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষ আর এগিয়ে আসবে না। জঙ্গিদের কাছ থেকে সামান্য তথ্য পেলেও সেটা দীর্ঘ তদন্ত করতে হবে। পুলিশ কি নিজে থেকে করল, না ওপরের কোনো নির্দেশনা ছিল তাও খতিয়ে দেখা উচিত।’1111

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অনেক তথ্যই আদায় করা হয়েছে। এখন ওই তথ্যের ভিত্তিতেই অপারেশন চলবে। ইতিমধ্যে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। জঙ্গি নিয়ে কাজ করেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক কর্মকর্তা বলছেন, ফাহিম কার নির্দেশে মাদারীপুর গিয়েছিল? কাদের মাধ্যমে সে হিযবুত তাহিররে যোগ দিয়েছিল? উত্তরা এলাকায় আরও কারা কারা এমন ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে জড়িত রয়েছে? তাদের কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে? একই সঙ্গে তাদের নেপথ্য মদদদাতারাই বা কারা? ফাহিম বেঁচে থাকলে এমন অনেক তথ্য আদায় করা সম্ভব হতো। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, মাদারীপুরের ঘটনায় যে জঙ্গি আসামিকে পুলিশ ক্রসফায়ারে দিয়েছে, সেটা নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। এ ঘটনার যে ম্যাজিস্ট্রেসি তদন্ত হবে, সেটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে করতে হবে। নইলে মানুষের মনে সন্দেহ থেকে যাবে। অনেক সময় ম্যাজিস্ট্রেসি তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘একজন জঙ্গি আসামিকে গ্রেফতার করার পর তার কাছ থেকে অনেক ধরনের তথ্য পাওয়া সম্ভব, যা জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে অনেক কাজে লাগতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদেও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ক্ষেত্রে অনেক তথ্য পাওয়া যেত। এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদের জঙ্গি সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্রকে সঠিক পদ্ধতি মেনে কাজ করতে হবে। গ্রেফতার জঙ্গিরা যেসব তথ্য দেয় তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ক্রসফায়ারে দিলে যতটুকু অগ্রগতি হলো সেটা আর হবে না।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেছেন, ‘কোনো আসামিকে আটকাবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে 01মারা হলে তা হবে সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ। তবে এর আগে প্রমাণ করতে হবে যে ইচ্ছাকৃত কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেছে কি না। যদি ইচ্ছাকৃত কোনো হত্যার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আমরা অবশ্যই বলব, পুলিশ বা রাষ্ট্র আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আর কেউ যদি আইন হাতে তুলে নেয়, তার জন্য চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সর্বোচ্চ আদালতে যেতে হবে। সর্বোচ্চ আদালতে যদি বিষয়টি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়, তাহলে দুটি কাজ হবে—এক. প্রতিবাদ হবে, দুই. পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য চলে আসবে। তারা যা ইচ্ছে তা-ই করতে পারবে না।’

প্রসঙ্গত, ১৯ মে ভোররাতে নরসিংদীতে দ্বীন ইসলাম নামের এক ব্যক্তিকে ঘর থেকে তুলে নেয় ডিবি পুলিশের ওসি মো. দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একদল পুলিশ। পরে পুলিশ হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ও এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবর দ্বীন ইসলাম হত্যাকারীদের বিচারের দাবি করে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। এর আগে সম্প্রতি পাবনার পাকশীতে পুলিশের এটিএসআই সুজাউল ইসলাম হত্যার প্রধান আসামি রুবেল হোসেনকে গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি ছিল, গ্রেফতারের পরদিন রুবেলকে নিয়ে অন্য আসামি গ্রেফতারের অভিযানের জন্য নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় রুবেল।
anigif (1)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s